দেশের চা খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাগানগুলোর আর্থিক সংকট কাটাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাগানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও লাভজনক ও টেকসই করে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
গত মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত চা শিল্পের উন্নয়নসংক্রান্ত মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটির প্রথম সভায় এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ চা দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে এবং বাকি অংশ রপ্তানি করা হয়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চায়ের গুণগত মান বাড়ানো এবং রপ্তানি সম্প্রসারণই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
পুরোনো বাগান আধুনিকায়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি:
বর্তমানে দেশের ১৭২টি চা বাগানের প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। তবে বহু বাগানের গাছ ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরোনো হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত নতুন গাছ না লাগানোর কারণে উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া শ্রমিকের মজুরি ও উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, কেবল ঋণনির্ভরতা নয়, বরং চা শিল্পকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে এটি নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতায় পরিচালিত হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।
সহনীয় সুদে ঋণ ও আর্থিক পুনর্গঠন:
চা খাতের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঋণের চাপ। এ খাতে খেলাপি ও বকেয়া ঋণের পরিমাণ কমাতে এবং সম্ভাবনাময় বাগানগুলোর চাকা সচল রাখতে ঋণ পুনঃতফসিলকরণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ৬ শতাংশ সুদে আবর্তক তহবিল গঠন এবং চা উৎপাদনে ঋণের সুদের হার ১৩.৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, চা চাষকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষি খাতের রেয়াতি ঋণসুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে।
বিকল্প আয় ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ:
চা বাগানের অব্যবহৃত ও চাষের অনুপযোগী জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সাথে যৌথ উদ্যোগে বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি বাগানের বিকল্প আয়ের পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিশেষায়িত চা:
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান শক্তিশালী করতে অর্থোডক্স ও বিশেষায়িত চা উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক মানসনদ অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও চা বোর্ডের সমন্বিত এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে চা খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: বাসস
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন