বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণপরিষদের সাবেক সদস্য, বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাক্ষরকারী ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুর রশীদ-এর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শুক্রবার (১৪ আগস্ট)।
দিবসটি উপলক্ষে তাঁর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মুনিরকান্দি গ্রাম এবং শহরের উদয়ন রোডের বাসভবনে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ ও মুকসুদপুরের বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বর্ণাঢ্য জীবন ও শিক্ষা
১৯৩৩ সালের ১ মার্চ মুকসুদপুর উপজেলার মুনিরকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী আব্দুর রশীদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর (এমএ) ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে আইন পেশায় যোগ দিয়ে গোপালগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। দীর্ঘ ৫২ বছরের আইনজীবী জীবনে অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসংগ্রামী
ষাট দশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন কাজী আব্দুর রশীদ। ছয় দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার দায়িত্ব নেন। যুদ্ধকালীন তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যুব শিবিরের দায়িত্ব পালন করেন এবং তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সেক্টরে পাঠানোর তদারকি করেন।
গণপরিষদ সদস্য ও ৩ বারের সংসদ সদস্য
কাজী আব্দুর রশীদ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসন থেকে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে মোট তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭২ সালে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংবিধানে স্বাক্ষর করেন—যা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
মানবসেবা ও সামাজিক অবদান
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখে গেছেন এই জননেতা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শরণার্থীদের পুনর্বাসন, দুর্যোগ-দুর্ভাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকায় একাধিক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি নিজ গ্রামে মায়ের নামে ‘আমেনা খাতুন কুরআনিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়
২০১২ সালে গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে বার্ধক্য সত্ত্বেও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। ২০১৪ সালের ১৪ আগস্ট ৮২ বছর বয়সে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই দূরদর্শী নেতা। রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় (গার্ড অব অনার) গোপালগঞ্জ মার্কাস মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে স্ত্রী হালিমা রশীদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
মরহুমের বড় ছেলে কাজী হারুন-অর-রশীদ মিরন তাঁর মরহুম পিতার আত্মার মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদাউস কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

আপনার মতামত দিন