হোম / মতামত / রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একটি বাস্তবসম্মত রূপরে...
মতামত
সাময়িক আশ্রয়ের বাইরে

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা

মশি শ্রাবন
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:৫১ অপরাহ্ন
১৮৬ বার পঠিত
ফন্ট:
মিয়ানমারে নির্মম জাতিগত সহিংসতার মুখে যখন ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়ে এই চরম নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর সমাধান ছাড়া কেবল উদারতা দেখানো কোনো কৌশল হতে পারে না। বহু বছর পর আজ এই সংকট এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে।

বহু বছর ধরে কক্সবাজারের বিস্তৃত বাঁশের তৈরি শরণার্থী শিবিরগুলো মানবিক ট্র্যাজেডি এবং বাংলাদেশের অসাধারণ উদারতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিয়ানমারে নির্মম জাতিগত সহিংসতার মুখে যখন ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়ে এই চরম নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর সমাধান ছাড়া কেবল উদারতা দেখানো কোনো কৌশল হতে পারে না। বহু বছর পর আজ এই সংকট এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। শিবিরগুলোতে দিন দিন নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, আন্তর্জাতিক সাহায্যকারীদের তহবিল কমে আসছে, আর বাংলাদেশ একা এই বিশাল বোঝা বহন করে চলেছে।

এই অচলাবস্থা ভাঙতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সাময়িক পদক্ষেপের বাইরে এসে সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য আঞ্চলিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে একটি বাস্তবসম্মত ও সুসংহত রূপরেখা প্রয়োজন।

অবিলম্বে প্রত্যাবাসনের অবাস্তবতা বনাম বাস্তবচিত্র
বহু বছর ধরে সব আনুষ্ঠানিক আলোচনা কেবল নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপরই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও প্রত্যাবাসনই মূল আইনি ও নৈতিক লক্ষ্য, তবুও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মৌলিক পরিবর্তন না এনে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর দাবি তোলা অবাস্তব। মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে এবং সেখানকার শক্তির ভারসাম্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার যেখানে মেলেনি, সেখানে একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে এই অসহায় পরিবারগুলোকে ফেরত পাঠানোর আশা করা যুক্তিযুক্ত নয়।

প্রত্যাবাসনকে একটি একক শর্ত হিসেবে না দেখে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ গ্রহণ করা। শূন্যতার মধ্যে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং রোহিঙ্গাদের আইনি মর্যাদা প্রদানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পুনঃঅংশগ্রহণ
এই সংকট সমাধানের একটি বড় অন্ধবিন্দু ছিল কেবল বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করা, যখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয় বা বিভক্ত থেকেছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি রয়েছে এশিয়ার দেশগুলোর হাতেই।

আঞ্চলিক প্রতিবেশী—বিশেষ করে আসিয়ান (অঝঊঅঘ) সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, চীন এবং ভারত—সবারই রাখাইন রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে অস্থিরতা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং মানবপাচার কারো দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষা করে না। তাই একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতিকে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির উন্নতির সাথে শর্তযুক্ত করতে হবে।

তদুপরি, রাখাইন রাজ্যের উল্লেখযোগ্য অঞ্চল বর্তমানে যে সমস্ত অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাদের সাথে আলোচনায় যুক্ত হওয়াও একটি অনিবার্য বাস্তবতা। ভবিষ্যতে যেন রোহিঙ্গা জনগণ নিরাপদে ফিরে যেতে পারে, সে লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণে থাকা স্থানীয় অংশীদারদের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

ত্রাণনির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরশীলতায় রূপান্তর
বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে কেবল মৌলিক ত্রাণ বিতরণের ওপর ভিত্তি করে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আর টেকসই নয়। বিশ্বজুড়ে একাধিক সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক তহবিলে টান পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিবিরের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার ওপর।

এখন নিষ্ক্রিয় সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে সক্রিয় দক্ষতা উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। শিবিরের অভ্যন্তরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে তাদের স্থায়ীভাবে রেখে দেওয়া হচ্ছে; বরং এটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল হতে প্রস্তুত করবে। শিক্ষিত ও দক্ষ জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে তাদের জীবন ও সমাজ পুনর্গঠনে অনেক বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়া তাদের কার্যকর কর্মসংস্থানে যুক্ত রাখলে তা শিবিরে অপরাধ ও মাদক চক্রের বৃদ্ধি রোধেও সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা
যে মৌলিক কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগ ঘটেছিল—অর্থাৎ মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে তাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারের ধারাবাহিক অস্বীকৃতি—তার সমাধান না হলে কোনো প্রত্যাবাসন চুক্তিই সফল হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বহুপাক্ষিক সংস্থা ও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন চাপ বজায় রাখতে হবে, যেন প্রতিটি প্রত্যাবাসনে স্পষ্ট আইনি নাগরিকত্ব, অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা এবং মৌলিক সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে।

রোহিঙ্গাদের মনে স্বদেশে ফেরার আস্থা তৈরির জন্য রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ-পরিচালিত নিরাপদ অঞ্চল বা বেসামরিক পর্যবেক্ষক উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি।

সামনের পথ
রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের একার বহন করার মতো কোনো মানবিক সংকট নয়; এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন, যার জন্য বিশ্বজুড়ে সুসংহত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রায় দশ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দী হয়ে থাকার বর্তমান স্থবিরতা বাংলাদেশের জন্য, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এবং সর্বোপরি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজেদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও টেকসই নয়।

কেবল তাৎক্ষণিক জরুরি প্রতিক্রিয়া জানানোর মানসিকতা পরিবর্তন করে কূটনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক দায়িত্ববোধ, শিক্ষার মাধ্যমে উন্নয়ন এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার স্পষ্ট কৌশলে হেঁটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশেষে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
 

ম
মশি শ্রাবন

প্রতিবেদক

আপনার মতামত দিন

ফটো কার্ড ডাউনলোড করুন
News Image
dailymatribhumi.com
logo
+