বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালীন কোনো মৌসুমী সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। গত দুই দশকে এই রোগের বিস্তার, সংক্রমণের ধরন এবং তীব্রতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে এডিস মশার প্রজননের সময়কাল ও বিস্তৃতি- উভয়ই বেড়েছে। গবেষণায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এ কারণেই এখন শুধু ঢাকা নয়, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু।
এর পেছনে আরও কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশের শহরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন নতুন সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, মানুষের চলাচল আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে শহরের প্রান্তবর্তী ও আধা-নগর এলাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে, কিন্তু সেই অনুপাতে পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে না। ফলে অনেক জায়গায় এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় ডেঙ্গু মহামারি দেখা দেয়, যা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। ২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ২০১৮ ও ২০১৯ সাল থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। ২০১৯ সালে দেশে প্রথম লাখ ছাড়ানো সংক্রমণের রেকর্ড হয়। এরপর ২০২০ থেকে ২০২২ সালের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২৩ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়; ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও সংক্রমণ উচ্চমাত্রায় বজায় ছিল এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই প্রায় ৬ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
কেন ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু?
এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিত নগরায়ন, এবং বাসাবাড়ির ছাদে বা টবে জমে থাকা পানি এই মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এছাড়া অসচেতনতা এবং ময়লা-আবর্জনা সময়মতো পরিষ্কার না করার কারণে এডিস মশার উপদ্রব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এডিস মশার প্রজনন মৌসুম ও বিস্তৃতি অনেক বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এবং মশক নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে আজ ডেঙ্গু শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরসহ সারা দেশের বিভাগীয় ও মফস্বল শহরগুলোতেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
লক্ষণ ও প্রাথমিক সতর্কতা
ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় এর লক্ষণগুলো সময়মতো চেনা জরুরি:
তীব্র জ্বর: শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।
শারীরিক ব্যথা: মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে তীব্র যন্ত্রণা এবং পেশি ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথা।
অন্যান্য উপসর্গ: বমি ভাব এবং ত্বকে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া।
বিশেষ সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক বা পেইনকিলার ওষুধ সেবন করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ
ডেঙ্গু মোকাবিলায় এককভাবে সরকারের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও উদ্যোগ:
পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা: বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও তিনদিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা: দিনেও পুরো শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং মশারি বা নিরাপদ মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করা।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা: জ্বর আসলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রচুর তরল খাবার (ডাবের পানি, ফলের জুস ও ওরস্যালাইন) গ্রহণ করা।
২০২৬ সালের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতাই হলো শ্রেষ্ঠ প্রতিকার। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই অদৃশ্য হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে নিজ নিজ জায়গা থেকে আমাদের সকলের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন