হোম / মতামত / বাংলাদেশের অর্থনীতির নেপথ্য নায়ক
মতামত
পরবাসের ঘাম ও ঘরের স্বপ্ন

বাংলাদেশের অর্থনীতির নেপথ্য নায়ক

আমির হোসেন
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ০৪:৫৫ অপরাহ্ন
৮২ বার পঠিত
ফন্ট:

ভোরের আলো ফোটার আগেই মাটির ব্যাংকে জমানো কয়েকটা টাকা আর বুকের ভেতর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যারা গ্রামের ধুলোমাখা পথ ছেড়েছিলেন, তাদের রূপকথা দিয়ে চেনা যায় না। চেনা যায় তাদের হাতের কড়ায়, কপালে জমে থাকা নোনা ঘামে আর মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র মরুভূমির উত্তাপে। প্রতিদিন বিদেশের মাটিতে তারা জীবনের সাথে জুঝছেন, আর তাদের পাঠানো অর্জিত অর্থ বা রেমিটেন্সের ওপর ভর করে দাপটের সঙ্গে বেঁচে আছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি। অথচ এই নেপথ্য নায়কদের গল্পগুলো প্রায়শই সংখ্যার মারপ্যাঁচে ঢেকে যায়, আড়ালেই থেকে যায় তাদের রক্ত-ঘামে ভেজা জীবনের অপ্রকাশিত বাস্তবতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবপত্র উল্টালে বড় বড় সংখ্যা চোখে পড়ে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ, জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ। কিন্তু এসব সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা নামগুলো একেকটা জীবন্ত সংগ্রামের ইতিহাস। কুমিল্লার জহিরুল কিংবা পাবনার রাজুর কথা ধরা যাক। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে যখন প্রথম দুবাই কিংবা রিয়াদের উদ্দেশে প্লেনটা উড়ায় দেয়, তখন তাদের চোখের সামনে শুধু পরিবারের একটু ভালো থাকার আশা খেলা করে। পেছনে পড়ে থাকে ভাঙা ঘর, বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কেনার চিন্তা আর ছোট বোনের বিয়ের ভবিষ্যৎ।

প্রবাসী কর্মীদের জীবন মোটেও আলোঝলমলে নয়। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় লড়াই। খটখটে রোদে টানা বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করা, সস্তা শেয়ারড রুমে একসাথে ছয়-আটজন গাদাগাদি করে থাকা আর নিজের মুখের আহার বাঁচিয়ে প্রতিটা টাকা দেশে পাঠানো—এই হলো বেশিরভাগ প্রবাসীর দৈনন্দিন রুটিন। বিদেশের তীব্র ঠান্ডা কিংবা দমবন্ধ করা গরমে যখন শরীর ভেঙে পড়ে, তখনও তারা কাজ থামান না। কারণ তারা জানেন, দেশে তাদের একটি ফোনকলের আশায় বসে আছে পুরো পরিবার। ঈদের দিনে যেখানে সবাই নতুন জামা পরে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে, সেখানে প্রবাসীদের কাটাত হয় নির্জন ঘরে, ফোন স্ক্রিনে স্বজনদের ছবি দেখে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অবদান কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ অর্থনীতির যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আজ আমরা দেখি—পাকা বাড়ি, উন্নত জীবনযাত্রা, শিশুদের স্কুলে যাওয়া কিংবা গ্রামীণ বাজারে ব্যবসার প্রসার—তার সিংহভাগই এসেছে এদের পাঠানো টাকা থেকে। দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে এবং আমদানির ব্যয় মেটাতে রেমিটেন্স একটি প্রাণভোমরার মতো কাজ করে। জাতীয় সংকটে কিংবা বিশ্বব্যাপী মন্দার সময়েও তারা দেশকে থামতে দেননি।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, যে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তারা নিজ দেশেই অনেক সময় প্রাপ্য সম্মান ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। দালালদের খপ্পরে পড়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দেওয়া থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে নেমে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হওয়া—তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিমানবন্দরে সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইন এবং লাগেজ খোয়ানোর মতো ঘটনা এখনও নিত্যদিনের দৃশ্য। প্রবাস থেকে অসুস্থ হয়ে বা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসার পর তাদের পুনর্বাসনের জন্য জোরালো কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই।

এখন সময় এসেছে কেবল 'রেমিটেন্স যোদ্ধা' উপাধিতে তাদের সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। প্রথমত, বিদেশে যাওয়ার খরচ কমাতে দালালচক্র নির্মূল করে সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ ও কম খরচে অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীদের বড় একটি অংশ দক্ষ কর্মীর অভাবের কারণে নিম্ন আয়ের কাজে নিযুক্ত থাকেন। তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যাতে তারা উচ্চ বেতনের কাজে নিযুক্ত হতে পারেন। এছাড়া হুন্ডি বা অবৈধ পথ ছেড়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসব ভাতা বা আকর্ষণীয় ইনসেন্টিভের পাশাপাশি প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

রেমিটেন্স যোদ্ধারা শুধু টাকা পাঠানোর যন্ত্র নন; তারা এই দেশের রক্তমাংসের প্রতিটি ইটের পেছনের কারিগর। তাদের ঘামের প্রতিটি ফোটা বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জ্বালানি সরবরাহ করে। যে প্রবাসীরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে দেশকে প্রতিনিয়ত টিকিয়ে রাখছেন, রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে তাদের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা, সম্মান এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

 

মাতুভূমি/এএইচ

আ
আমির হোসেন

প্রতিবেদক

আপনার মতামত দিন

ফটো কার্ড ডাউনলোড করুন
News Image
dailymatribhumi.com
logo
+