বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল অর্থনীতির সাফল্য হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিল, যেখানে বজায় ছিল ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বাজারদর। তবে আজ সেই অগ্রযাত্রার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশজুড়ে পরিবারগুলো জীবনযাত্রার তীব্র ব্যয়ের চাপে নাভিশ্বাস তুলছে, যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি প্রায় এক দশকের সর্বোচ্চ সীমা অর্থাৎ ৯ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। মহামারী-পরবর্তী সময়ে পণ্যের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সাধারণ পরিবারগুলো নিত্যদিনের মৌলিক খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং নীতিনির্ধারকরাও বাধ্য হচ্ছেন অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর মুখোমুখি হতে।
কেন পণ্যের দাম এভাবে চড়া হয়ে রয়েছে, তা বুঝতে হলে বৈশ্বিক ধাক্কা এবং দেশের ভেতরের বাস্তবতা—উভয় দিকই পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জ্বালানি, সার ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় ও বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, যার ফলে আমদানিকৃত পণ্য দেশে আনতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে দেশীয় ক্ষেত্রে, বিগত বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বাজারের অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমানোর কারণে গণপরিবহন, কৃষি ও উৎপাদন খাতে তাৎক্ষণিক খরচের বড় ধাক্কা লেগেছে। এর বাইরে অপ্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে, যা চাল ও সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কেবল খাতা-কলমের হিসাব কিংবা ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর উপার্জনের সিংহভাগই চলে যায় খাদ্য ও মৌলিক সেবামূল্যের পেছনে। ফলে প্রতিবার জিনিসপত্রের দাম বাড়লে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জায়গায় কঠিন আপস করতে হয়। একইভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পড়েছে এই সংকটের মুখে। কাঁচামালের বাড়তি দর সামলাতে গিয়ে ছোট ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মুখোমুখি হচ্ছে মুনাফার হার কমে যাওয়া ও ঋণ নেওয়ার বাড়তি খরচের। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির এই ধারা দেশের সার্বিক চাহিদা দুর্বল করা, জাতীয় বিনিয়োগের গতি ধীর করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বিগত বছরগুলোর অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য একাধিক দিক থেকে সুসংগঠিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি সুশৃঙ্খল মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে, যাতে প্রবৃদ্ধির গতি পুরোপুরি স্তব্ধ না করে সুদের হার সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সামলানো যায়। রাজস্ব নীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে হবে—যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ঋণের নির্ভরতা কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের চেয়ে উচ্চ-প্রভাবশালী সরকারি প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। সর্বোপরি, বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, কোল্ড-স্টোরেজ বা হিমাগার অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণের মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করার মাধ্যমে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন