দক্ষিণী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির মেগাস্টার রজনীকান্ত অভিনীত ও নেলসন দিলীপকুমার পরিচালিত নতুন সিনেমা ‘জেলার ২’ প্রেক্ষাগৃহে আসতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ছবিটির মুক্তির আগে নির্মাতারা আয়োজন করেছিলেন এক বিশেষ ‘সুপার শো’। সে অনুষ্ঠানে সিনেমার পুরো দলের উপস্থিতিতে নিজের জীবনের নানা অনুভূতির কথা অকপটে ভাগ করে নেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।
অনুষ্ঠান চলাকালে পরিচালক নেলসন দিলীপকুমার রজনীকান্তের চিরচেনা বিনয়ী স্বভাবের রহস্য জানতে চান। তিনি প্রশ্ন করেন— তার এই বিনয় কি সহজাত, নাকি তারকাখ্যাতির কারণে নিজেকে এমনভাবে গুটিয়ে রাখেন?
উত্তরে বিনম্র হেসে রজনীকান্ত বলেন, ‘দেখুন, আমি তারকা হলেও অভিনয়টা খুব ভালোবাসি। তবে তার চেয়েও বেশি আনন্দ দিত বাস কন্ডাক্টরের চাকরি। একটানা পাঁচ বছর বাস কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করেছি। আজও সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। সত্যি বলতে, নিজেকে কোনো দিন প্রথাগত অর্থেই তারকা বলে মনে করতে পারিনি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই পরিচিতি, যশ কিংবা প্রতিপত্তি— সবই ভালো। তবে আমি মানসিকভাবে এখনও সেই কন্ডাক্টর হিসেবে নিজেকে দেখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সে কারণেই মাঝে মাঝেই বেঙ্গালুরু ছুটে যাই। বাস কন্ডাক্টরদের নানা পেশা ও স্বভাবের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, যা থেকে জীবনের অনেক বড় শিক্ষা মেলে। একজন সাবেক বাস কন্ডাক্টর হিসেবে আপনার মতো গুণী মানুষের সামনে আমার বিনয়ী আচরণ ছাড়া তো অন্য কিছু মানায় না!’
রজনীকান্তের এই হৃদয়স্পর্শী কথায় পুরো মিলনায়তন জুড়ে করতালির বন্যা বয়ে যায়। পরিচালক নেলসন হেসে উঠে বলেন, ‘স্যার, আমি জানতাম আপনি ঠিক এমনই একটি সুন্দর উত্তর দেবেন।’
খ্যাতির চূড়ায়
২০১৪ সালে যখন রজনীকান্ত টুইটারে (বর্তমানে এক্স) যোগ দেন, এক রাতেই ২ লাখ ১০ হাজার অনুসারী পান; যা ছিল তখনকার দিনে ভারতের সব তারকার মধ্যে দ্রুততম। ২০২৩ সালে তামিল ছবি ‘জেলার’ বক্স অফিসে ৬০০ কোটির বেশি আয় করে। রজনী হয়ে ওঠেন একমাত্র ভারতীয় অভিনেতা, যাঁর দুটি ছবি ৫০০ কোটির গণ্ডি পেরিয়েছে। লোকেশ কঙ্গরাজের ‘কুলি’র (২০২৫) জন্য নাকি তিনি ২৭০ কোটি রুপি পাচ্ছেন।
ছবি মুক্তির আগে তাঁর ভক্তরা সিনেমা হলের পোস্টার ও বিশাল কাটআউটে দুধ ঢালেন। কেউ কেউ দিনে ১১ থেকে ১৬ হাজার গ্যালন দুধ ঢালেন, যা মাঝেমধ্যে স্থানীয় দুধের সংকট তৈরি করে। দুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন পর্যন্ত তাঁকে অনুরোধ করেছে, ভক্তদের এই অপচয় বন্ধ করতে।
শিবাজি গাও গায়কোয়াড় থেকে রজনীকান্ত
১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর শিবাজি রাও গায়কোয়াড় নামে জন্ম। চার ভাই–বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন কনিষ্ঠ। বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। বাবার অবসরের পর পরিবার চলে যায় হনুমন্থ নগরে। মাত্র ৯ বছর বয়সে হারান মাকে।
গাভিপুরম গভর্নমেন্ট কন্নড় মডেল প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেন রজনীকান্ত। ছিলেন যেমন পড়াশোনায় মনোযোগী, তেমনি দুষ্টামিতেও পটু। ক্রিকেট, ফুটবলের মতো খেলায়ও ছিল তাঁর আগ্রহ। পরে ভাই তাঁকে ভর্তি করিয়ে দেন রামকৃষ্ণ মিশনে। সেখানেই আধ্যাত্মচর্চার প্রতি অনুরাগ তৈরি হয় তাঁর, আর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জাগে। মঞ্চনাটকে অভিনয় করে শিক্ষক-সহপাঠীদের প্রশংসা কুড়ান। জীবনে বিচিত্র সব কাজ করেছেন। কখনো অফিস বয়, কুলি, কাঠমিস্ত্রি, বাস কন্ডাক্টর। বাসে টিকিট দেওয়া আর খুচরা ফেরানোর ভঙ্গি এতই জনপ্রিয় ছিল যে যাত্রীরা তাঁর বাসের জন্য অপেক্ষা করতেন। কাজ যা–ই করুন অভিনয়ের স্বপ্ন ছাড়েননি। পরিবার প্রথমে আপত্তি জানালেও বন্ধুর সহায়তায় ভর্তি হন মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। পরে অল্প কিছু তামিল শব্দ জেনেই মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখানেই পরিচালক কে বালাচন্দর তাঁকে নতুন নাম দেন—রজনীকান্ত, ‘রজনী’ অর্থাৎ রাতের রং।
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন