বয়সের পৌনে শতক পেরিয়ে গেলেও প্রেক্ষাগৃহে দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্তের আধিপত্য যে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি, তার তাজা প্রমাণ মিলল ‘জেলার ২’ সিনেমার হাত ধরে। রজনীকান্তের চিরাচরিত স্টাইল, দুর্দান্ত পর্দা উপস্থিতি এবং টানটান অ্যাকশনে আবারও মন্ত্রমুগ্ধ দর্শক। মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে ঝড় তোলা অ্যাকশন-কমেডিনির্ভর এই তারকাখচিত সিনেমাটি দর্শকমহলে অভাবনীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী ছবিটির গ্রস আয় ছাড়িয়ে গেছে ৫৮২ কোটি রুপির ঘর।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৮২ কোটি ৪৫ লাখ রুপি ব্যবসা করেছে সিনেমাটি। এর মধ্যে ভারতের ঘরোয়া বাজার থেকেই উঠে এসেছে ৩৭১ কোটি ৪৫ লাখ রুপি, আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ২১১ কোটি রুপি। এই জোরালো বাণিজ্যিক সাফল্যের সুবাদে ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে রজনীকান্তের এই মহামাশা সৃষ্টি।
২০২৩ সালের সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার ‘জেলার’-এর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর এই দ্বিতীয় কিস্তি নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। দীর্ঘ তিন বছরের প্রতীক্ষা শেষে পরিচালক নেলসন দিলীপকুমারের নির্দেশনায় বড়পর্দায় ফিরলেন রজনীকান্ত। আগের কিস্তির মতো এতেও তাঁর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছেন রামিয়া কৃষ্ণন ও মিরনা। তবে এবার বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছেন মিঠুন চক্রবর্তী, মোহনলাল, শিবা রাজকুমার, জ্যাকি শ্রফ, হৃতিক রোশন, বিদ্যা বালান ও বিজয় সেতুপতির মতো ভারতখ্যাত একঝাঁক মহাতারকা।
সিনেমার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মর্মান্তিক ঘটনার পর সাবেক জেলার টাইগার মুথুভেল পান্ডিয়ান (রজনীকান্ত) সাধারণ জীবনে ফিরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সুপার মার্কেট পরিচালনা, সংসার সামলানো আর নাতি ঋত্বিকের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোতে যখন শান্তির ছায়া, ঠিক তখনই মূর্তি পাচারকারী চক্রের জালে জড়িয়ে পড়ে তাঁর পরিবার। আবার সুপ্ত সিংহকে জাগিয়ে তুলতে বাধ্য হন মুথু; শুরু হয় রক্তগরম করা অ্যাকশন, সংঘাত ও নতুন রোমাঞ্চের অধ্যায়।
পরিচালক নেলসন দিলীপকুমারের ট্রেডমার্ক নির্মাণশৈলীতে প্রথমভাগে হাসির খোরাক যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে রজনীকান্তের নিখুঁত চোখের ইশারা ও অঙ্গভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ধূলোসাৎ করার রাজকীয় দৃশ্য। আর দ্বিতীয়ার্ধে গল্পটি আরও গতিময় ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেখানে মূর্তি পাচারকারীদের প্রধানদের মুখোমুখি হয়ে টাইগারকে ফের নিজের শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হয়।
প্রায় তিন ঘণ্টার এই বিশাল ক্যানভাসের চলচ্চিত্রে অসংখ্য চরিত্রের মেলা। লার্জার-দ্যান-লাইফ বিনোদনের স্বার্থে যুক্তির চেয়ে পর্দায় উদযাপনের উন্মাদনাই এখানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেক্ষাগৃহ জুড়ে দর্শকদের সিটি, তালি ও অট্টহাসি তারই প্রমাণ—বিশেষ করে নমো নারায়ণ ও যোগী বাবুর কমেডি দৃশ্যগুলো দর্শকদের পেটে খিল ধরিয়েছে।
তারকাদের ক্যামিও বা বিশেষ উপস্থিতি সিনেমাটির বিনোদনমূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নরসিমহা রূপে শিবা রাজকুমারের দাপুটে উপস্থিতি নজর কাড়লেও মোহনলালের স্ক্রিনটাইম আরেকটু বেশি হলে দর্শকরা খুশি হতেন। অন্যদিকে জ্যাকি শ্রফের চরিত্রটি কিছুটা অপ্রয়োজনীয় ঠেকলেও বিশেষ দৃশ্যে হৃতিক রোশনের চমকপ্রদ প্রবেশ প্রেক্ষাগৃহে তালি কুড়িয়েছে, যদিও চরিত্রটি আরও সুচারুভাবে ব্যবহারের সুযোগ ছিল।
বাঙালি দর্শকদের জন্য বিশেষ চমক ছিল মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি। 'চক্রি কল্পক' চরিত্রে হুইলচেয়ারে বসেই কেবল তীব্র সংলাপ ও চোখের ধারালো অভিব্যক্তিতে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। বোধি চরিত্রে এস জে সুরিয়া দুর্দান্ত এবং দিলীপ চরিত্রে সুরজ ভেঞ্জারমডু প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তবে কান্তা চরিত্রে বিদ্যা বালানের উপস্থিতি আরেকটু গভীর হতে পারত। সিনেমা শেষ মুহূর্তে বিজয় সেতুপতির সংক্ষিপ্ত প্রবেশ দর্শককে আগামী কিস্তির জন্য প্রবল কৌতূহলী করে রেখে যায়।
অনিরুদ্ধের আবোহসংগীত ও হাই-ভোল্টেজ ট্র্যাকগুলো অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে যেন আলাদা প্রাণ জুগিয়েছে। তবে সব ছাড়িয়ে সিনেমাটির আসল প্রাণভোমরা রজনীকান্ত নিজেই। ৭৫ বছর বয়সেও তাঁর অসাধারণ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, সংলাপ পরিবেশনের ধরণ এবং শারীরিক ক্ষিপ্রতা এক কথায় অতুলনীয়। রজনীকান্ত যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন—মহাতারকাদের ক্ষমতা ও আবেদনকে বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না।
অবশ্য তুমুল বাণিজ্যিক সাফল্যের মাঝেও গল্পে কিছু অপূর্ণতা থেকে গেছে। প্রথম কিস্তিতে বাবা-ছেলের আবেগীয় ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব গল্পকে যে মানবিক গভীরতা দিয়েছিল, এবার সেই আবেগের তীব্রতা কিছুটা কম। সত্য উন্মোচনের পর পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রতিক্রিয়াও বড্ড তড়িঘড়ি করে দেখানো হয়েছে।
এসব ছোটখাটো খামতি সত্ত্বেও অ্যাকশন, নিখাদ কমেডি এবং মহাতারকাদের জমকালো উপস্থিতির শক্তিতে ‘জেলার ২’ দর্শককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধরে রাখতে সফল হয়েছে। প্রথম সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে ৫৮২ কোটি রুপির বিশাল আয়ই বলে দেয় বক্স অফিসে কতটা দাপটের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে রজনীকান্তের এই রথ। এখন দেখার বিষয়, সামনের দিনগুলোতে আয়ের নতুন কী কী রেকর্ড গড়তে পারেন ৭৫ বছরের এই তরুণ রজনীকান্ত!
মাতুভূমি/এএইচ

আপনার মতামত দিন