যাকে ভাবা হয় ২০ ওভারের ফরম্যাটের সবচেয়ে কার্যকর ও মিতব্যয়ী বোলার, সেই মোস্তাফিজুর রহমানই কি না ২ ওভারে দিয়ে বসলেন ৪১ রান! অন্যদিকে লো-স্কোরিং ম্যাচে বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদের ৩ ওভারে ৩৩ রান দেওয়াটাও ছিল বেশ ব্যয়বহুল। ওই দুই বাঁহাতির হতাশাজনক আলগা বোলিংয়ের কারণেই কি এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে গেল বাংলাদেশ?
টাইগার সমর্থকদের এখন একটাই আক্ষেপ—মোস্তাফিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম খরুচে বোলিংটা কেন আজই হতে হলো?
আজ ১ অক্টোবর সকালে জাপানের নিশিনের করোগি স্পোর্টস পার্কে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ৬ উইকেটে পরাজয়ের পর সমর্থকদের মুখে মুখে এখন কেবলই হতাশার সুর।
কেন ভক্তরা মোস্তাফিজ আর নাসুমের ওপর সব দায় চাপাচ্ছেন? কারণ হিসেবটা খুব পরিষ্কার—মোস্তাফিজের বোলিং ইকোনমি ছিল ওভারপ্রতি ২০.৫০ এবং নাসুমের ইকোনমি ছিল ১১। অথচ দলের বাকি তিন বোলার নিজেদের কাজটা বেশ ভালোভাবেই করেছিলেন। শেখ মাহেদি ৩ ওভারে ১৭ রানে ১টি, রিশাদ হোসেন ২.৩ ওভারে ১২ রানে ১টি এবং শরিফুল ইসলাম ১ ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছিলেন।
নাসুম ও মোস্তাফিজ যদি বাকি তিনজনের মতো নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে পারতেন, হয়তো বা ম্যাচের চিত্র ভিন্ন হতো। মোস্তাফিজ ২০ রানের বদলে ১০ রান দিলেও লড়াইটা জমে উঠত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—সব দোষ কি শুধুই মোস্তাফিজ আর নাসুমের? ব্যাটারদের কি কোনো দায় ছিল না?
তাওহিদ হৃদয় ছাড়া পুরো ব্যাটিং লাইনআপের একজন ব্যাটারও লড়াই করতে পারেননি। তাদের ব্যর্থতার কারণেই দল বড় পুঁজি পায়নি, ফলে বোলারদের হাতেও ছিল না লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত রান। বৃষ্টির কারণে ১৩ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে মাত্র ১১১ রান (৭ উইকেটে) তুলতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
ব্যাটারদের এই আসা-যাওয়ার মিছিলেও একপ্রান্ত আগলে রেখেছিলেন তাওহিদ হৃদয়। শেষ দিকে চার-ছক্কার ঝড়ে ২৫ বলে ৪২ রানের (৪টি ছক্কা ও ২ বাউন্ডারি) এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে দলকে শতরান পার করান তিনি। অথচ হৃদয় ছাড়া কেবল ওপেনার সাইফ হাসান (১৯) ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত (১১) দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছান। তানজিদ হাসান তামিম (৭), অধিনায়ক লিটন দাস (২), পারভেজ হোসেন ইমন (১) ও রিশাদ হোসেনদের (২) ব্যর্থতায় শুরুতেই ৩১ রানে ৩ উইকেট এবং ৪৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।
একইভাবে পাকিস্তানও শুরুতে ব্যাকফুটে ছিল। ১৬ রানে ২ এবং ৩৮ রানে ৩ উইকেট হারানো পাকিস্তানের পঞ্চম উইকেট পতন ঘটতে পারত, কিন্তু পঞ্চম উইকেটে হাসান নাওয়াজ (২৭*) ও আব্দুল সামাদ (৩০*) অবিচ্ছিন্ন ৫৯ রানের অবিশ্বাস্য জুটি গড়ে ৯ বল বাকি থাকতেই ৬ উইকেটের জয় ছিনিয়ে নেন।
টানা বৃষ্টির কারণে কভারে ঢাকা উইকেটে আর্দ্রতা জমে ছিল। ফলে টস হেরে ভেজা কন্ডিশনে প্রথমে ব্যাটিং করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারেননি, আবার মাঝে হৃদয়কে সঙ্গ দেওয়ার মতোও কেউ ছিলেন না।
সুতরাং, কেবল মোস্তাফিজ বা নাসুমের ঘাড়েই সব দোষ চাপানো যৌক্তিক নয়। হৃদয় ছাড়া পুরো দলই কন্ডিশন ও পরিস্থিতি বিচারে নিজেদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানের দুই ডানহাতি ব্যাটার যেভাবে টাইগার বাঁহাতি বোলারদের সামলেছেন, বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা পাকিস্তানের বাঁহাতি স্পিনার আরাফাত মিনহাস ও সুফিয়ান মুকিমদের স্পিন সামলাতে চরম ভুল করেছেন।
সংসংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো অজুহাত বা টসের ওপর দায় না চাপিয়ে মানতে হবে—মাঠে নিজেদের কাজটা ঠিকঠাক করতে না পারার সমন্বিত ব্যর্থতাতেই আজ হাতছাড়া হলো পদকের সোনালী স্বপ্ন।
মাতুভূমি/এএইচ

আপনার মতামত দিন