দেশে অন্ধত্বের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী ছানি রোগ। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ এই বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে দেশে ছানি অস্ত্রোপচারে দক্ষ ও সক্রিয় সার্জনের সংখ্যা মাত্র ৪০০ থেকে ৮০০ জনের মতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্জনের ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার অভাব এবং সচেতনতার অভাবেই চিকিৎসাযোগ্য এই রোগটি দীর্ঘদিন ধরে অনেকের অন্ধত্বের প্রধান কারণ হয়ে রয়েছে।
আজ ৮ অক্টোবর ‘বিশ্ব দৃষ্টি দিবস’ উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘লাভ ইউর আইস’ বা চোখকে ভালোবাসুন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা ব্যবহার এবং সময়মতো ছানি অস্ত্রোপচার করা হলে অন্ধত্বের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী জানান, সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ ছানি অস্ত্রোপচার করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রতিবছর নতুন করে লাখের বেশি রোগী যুক্ত হওয়ায় ব্যাকলগ বা অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমছে না। আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর অতিরিক্ত অন্তত দুই লাখ ছানি অস্ত্রোপচার না করা গেলে এই সংকট কাটানো কঠিন হবে। এজন্য ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করে জেলা হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল দিয়ে সমৃদ্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান জানান, ২৫০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়াকে অনেকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা করেন, অথচ সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার করা হলে স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও নারীরা ছানি চিকিৎসায় পিছিয়ে রয়েছেন। দেশের আট জেলায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছানি অস্ত্রোপচারের হার পুরুষদের মাঝে ৭৬.৬ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৬৪.৩ শতাংশ।
জাতীয় অন্ধত্ব জরিপ-২০২০ অনুযায়ী, দেশে ৩০ বছর ও এর বেশি বয়সীদের মধ্যে অন্ধত্বে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখের বেশি, যার মধ্যে পাঁচ লাখের অধিক মানুষ ছানিজনিত অন্ধত্বে ভুগছেন। তবে দুই দশকের ব্যবধানে দেশে অন্ধত্বের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। শুধু ছানি নয়, দেশে ৪৮.৬ শতাংশ মানুষের দৃষ্টিত্রুটি থাকলেও মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ চশমা ব্যবহারের সুযোগ পান।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, গত দুই দশকে অন্ধত্ব নিরসনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে জুনিয়র কনসালট্যান্টদের পদায়ন করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং বেসরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে ছানি অস্ত্রোপচারের সুযোগ রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ছানি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন এমন সব রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন