ম্যাচের ৮২ মিনিট পর্যন্ত ৩-১ গোলে এগিয়ে ছিল রোমা। গ্যালারিতে তখন জয়ের অপেক্ষা। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে জয়টা যেন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন রিয়াল, তখন শেষ বাঁশির আগে জয় নিশ্চিত ভাবার সুযোগ নেই। অলিম্পিক স্টেডিয়ামে আরও একবার সেটিই প্রমাণ করল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। শেষ সাত মিনিটে তিন গোল করে রোমার কাছ থেকে ৪-৩ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিয়েছে জোসে মরিনিওর দল।
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানো রিয়াল মাদ্রিদের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে রোমার বিপক্ষে এই জয় গড়েছে নতুন ইতিহাস। টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে চারটি ম্যাচে দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও জয় পাওয়ার কীর্তি গড়েছে মাদ্রিদের ক্লাবটি। এর আগে ২০০৪ সালে রোমা, ২০২৩ সালে লিভারপুল ও ২০২৪ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষেও এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই নিজেদের মাঠে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে রোমা। ২০ মিনিটে মাতিয়াস সুলের পাস থেকে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে শটে দলকে এগিয়ে দেন মার্তেন দে রুন। তবে পাঁচ মিনিট পরই সমতায় ফেরে রিয়াল। কিলিয়ান এমবাপ্পের শট জিয়ানলুকা মানচিনির পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের শততম ম্যাচে এটি ছিল এমবাপ্পের ৭২তম গোল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেয় রোমা। মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে রিয়ালকে বড় বিপদে ফেলেন দোনিয়েল মালেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথম গোল করেন ডাচ ফরোয়ার্ড। এরপর ঠান্ডা মাথায় নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন তিনি। শুরুতে অফসাইডের পতাকা উঠলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
দুই গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর রক্ষণ সামলাতে মনোযোগী হয় রোমা। কোচ গাসপেরিনি একের পর এক বদলি এনে ব্যবধান ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু রিয়ালের বিপক্ষে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ার মাশুল দিতে হয় শেষ মুহূর্তে।
রিয়াল কোচ জোসে মরিনিওর বদলির সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ৫৯ মিনিটে ভিনিসিয়ুস ও ডামফ্রিজকে তুলে নিয়ে এনদ্রিক ও আরদা গুলেরকে মাঠে নামান তিনি। পরে দিয়ামন্দের জায়গায় নামানো হয় কার্লোস এসপিকে। শেষ দিকে তিন বদলি খেলোয়াড়ই রিয়ালের প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
৮৩ মিনিটে এনদ্রিকের হেড গোলরক্ষক গোলিনি ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বলে জালে বল পাঠান এসপি। ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩-২। পাঁচ মিনিট আগে মাঠে নামা এই বদলি ফরোয়ার্ডের গোলেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় রিয়াল।
এরপর ৮৮ মিনিটে গুলেরের কর্নার থেকে হেডে গোল করে সমতা ফেরান এনদ্রিক। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এমন পরিস্থিতিতে রোমার সমর্থকদের হতাশা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে রিয়ালের ক্ষুধা তখনো মেটেনি। ৯০ মিনিটে গুলেরের আরেকটি সেট পিস থেকে কাছ থেকে ভলিতে গোল করে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন পূর্ণ করেন আন্তোনিও রুডিগার।
৩-১ থেকে ৪-৩। মাত্র সাত মিনিটে তিন গোল। রোমার সাজানো উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হয় হতাশায়।
এই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে সবচেয়ে বেশি আলো কেড়েছেন ব্রাজিলিয়ান তরুণ এনদ্রিক। চলতি মৌসুমে রিয়ালের জার্সিতে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ম্যাচ। এর আগে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র চার মিনিট। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে গোল করে দলকে সমতায় ফেরানোর পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন তিনি।
ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে এনদ্রিক বলেন, “ম্যাচের আবেগ এখনো আমার মধ্যে কাজ করছে। আমি তখন বেঞ্চে বসে ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। পাশে তাকাতেই দেখি নুনো আমাকে ডাকছে। আমি মাঠে নামলাম এবং ঈশ্বরের সঙ্গে কথা চালিয়ে গেলাম। কারণ, ভাবিনি এত কম সময়ে আমাকে নামানো হবে। মাঠে নেমে আমি আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজটিই করতে পেরেছি, আর তা হলো ফুটবল খেলা।”
মরিনিও মাঠে নামানোর সময় কী বলেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে এনদ্রিক বলেন, “মরিনিওর সঙ্গে কথা বলার সময় তাকিয়ে দেখি রোমার মালেন আরেকটি গোল করল। কিন্তু আমরা রিয়াল মাদ্রিদ, আর স্কোর যেমনই হোক না কেন, আমরা ম্যাচে লড়াই করতেই নামি। ৩-১ থেকে আমরা যেভাবে ৪-৩ করলাম, তাতে প্রমাণ হয় যে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
প্রথমার্ধে দলের ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধেই নিয়েছেন মরিনিও। সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল কোচ বলেন, “প্রথমার্ধের দায় কোচের, দ্বিতীয়ার্ধের দায় খেলোয়াড়দের। ফুটবল ৯০ মিনিটের কৌশলগত খেলা। প্রতিপক্ষের গুরুত্ব আছে, আজ প্রতিপক্ষ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী। আমি প্রয়োজন অনুযায়ী বদলি খেলোয়াড় নামিয়েছি। তবে প্রথমার্ধে তারা সত্যিই আমাদের শাস্তি দিয়েছে।”
এদিকে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তবে মরিনিওর মতে, এমন প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। রোমার দ্বিতীয় গোলের সময় বল হারানোর জন্য ভিনিসিয়ুসের ভুলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মরিনিও বলেন, “ভিনির জন্য বিষয়টি কঠিন। রোমার দ্বিতীয় গোলের সময় সে এমন একটি বল হারিয়েছে, যা তার কোনোভাবেই হারানো উচিত ছিল না। তবে খেলায় এমনটা হতেই থাকে। আমিও ভুল করি। তার মন খারাপ হতেই পারে। তবে ম্যাচ শেষে সে জয় নিয়ে ভীষণ খুশি ছিল।”
রোমার সমর্থকদের কাছে রাতটি ছিল হতাশার, আর রিয়ালের জন্য আরেকটি স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প। মরিনিওকে সম্মান জানিয়ে গ্যালারিতে ব্যানার টানিয়েছিলেন স্বাগতিক সমর্থকেরা। ২০২১-২২ মৌসুমে এই রোমাকেই কনফারেন্স লিগ জিতিয়েছিলেন পর্তুগিজ কোচ। পরের মৌসুমে দলকে তুলেছিলেন ইউরোপা লিগের ফাইনালে। অথচ সেই প্রিয় কোচের দলই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তাদের জয়।
চ্যাম্পিয়নস লিগে শেষ বাঁশি বাজার আগে রিয়াল মাদ্রিদকে হিসাবের বাইরে রাখা যায় না—রোমা এবার তা হাড়ে হাড়ে টের পেল।
মাতুভূমি/এএইচ

আপনার মতামত দিন