উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির সুনির্দিষ্ট রূপায়ন শুরু হয়েছে। সরকারের সামগ্রিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এ মহাপরিকল্পনার মূল প্রশাসনিক ও কারিগরি দিক বাস্তবায়নের প্রাথমিক কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া তিস্তা-সংক্রান্ত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। মহাপরিকল্পনার মূল কাজ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিরূপণের লক্ষ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই উদ্যোগ অনুমোদিত হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিশ্বমানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে, যা মেগা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য উত্তরাঞ্চলের স্থায়ী বন্যা ও নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা। এর আওতায় যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে—
১১০ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা এবং ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও সংস্কার।
১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা।
২২৪ কিলোমিটার শক্তিশালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং এর ওপর পাকা সড়ক নির্মাণ।
নদীশাসনের মাধ্যমে নদীসংলগ্ন প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি পুনরুদ্ধার ও তা কৃষি-শিল্পে ব্যবহার।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাউবো) মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন জানান, এই সমন্বিত পরিকল্পনা কেবল নদী রক্ষাই করবে না, বরং আঞ্চলিক সংযোগ ও সেচব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও এর ওপর তৈরি সড়ক উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়ে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে কাজ করবে।
নদী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ মনে করেন, নদীর পলি ব্যবস্থাপনা ও গতিপ্রকৃতি সঠিকভাবে বিবেচনা করেই ড্রেজিং কার্যক্রম সফল করা সম্ভব। এছাড়া বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান জানান, উজান-ভাটির পানিপ্রবাহ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম সাহাবুদ্দিন বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তবে রূপ দিতে এই সমীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে ব্যারেজ, নদীশাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি সংরক্ষণসহ প্রতিটি খাতের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও দৃঢ় সংকল্পের কথা তুলে ধরার পরই এই প্রকল্পের কাজে গতি এসেছে। রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মতো প্রান্তিক জেলাগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং বর্ষায় ভয়াবহ ভাঙন রোধে এই মহাপরিকল্পনা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, বরং উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক।
সূত্র: বাসস
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন