হোম / জাতীয় / প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আড়ালে হচ্ছেটা কি!
জাতীয়

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আড়ালে হচ্ছেটা কি!

ভোগান্তিতে সাধারন অভিবাসী কর্মীরা
মশি শ্রাবন
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ১০:১৬ পূর্বাহ্ন
১২৭ বার পঠিত
ফন্ট:

সরকার বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি সাধারন কর্মীদের কল্যাণ ফি ৩,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,৫০০ টাকা করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সংশোধিত ফি ১লা অক্টোবর থেকে কার্যকরের সিদ্ধন্ত নিয়েছে।

বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের যাত্রার আগে ফি পরিশোধ করে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সদস্য হতে হয়। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অভিবাসী শ্রমিকদের সার্বিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ফি সংশোধন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে যে এই ফি বর্তমান মুদ্রমান (ডলার) ও বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হয়েছে।

প্রবাসীদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রবাসী ওয়েজ আর্নার্স বোর্ড আইন-২০১৭ সালে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড পরিচালনায় ১৬ সদস্য বিশিষ্ঠ কমিটি নিয়ে পরিচ্লানার অনুমোদন হয়েছিল, পরবর্তীতে ১১ সদস্য বিশিষ্ঠ বোর্ড গঠন করে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রত্যেক সদস্যের মেয়াদ হবে তিন বছর। তবে সরকার মেয়াদ শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় কারন দর্শানো ব্যাতিরেকে মনোনীত কোনো সদস্যকে সদস্য পদ হইতে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবে,এবং  মনোনীত কোনো সদস্য ও সরকারের উদ্দেশ্যে স্বীয় স্বাক্ষর যুক্ত পত্রযোগে  পদত্যাগ করিতে পারিবেন। 

এই বোর্ডের সুনির্দিষ্ট কাজের মধ্যে রয়েছে: প্রবাসীদের কল্যাণার্থে প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন, যুদ্ধাবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিয়োগ কারী প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থা বা অন্য কোন জরুরি পরিস্থিতির কারণে এদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং ক্ষেত্র বিশেষ দেশে প্রত্যাবর্তনের সহায়তা প্রদান, দেশে প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে  পুনর্বাসন করা, অভিবাসী কর্মীদের বিদেশ গমনের জন্য প্রাক-বহির্গমন ব্রিফিং সেন্টার স্থাপন, পরিচালনা ও ব্রিফিং প্রদান করা।

এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম সমূহ গুলো হচ্ছে: শিক্ষাবৃত্তি, প্রতিবন্ধী ভাতা, রি-ইন্টিগ্রেশন আর্থিক অনুদান, চিকিৎসা সেবা, এম্বুলেন্সে সেবা, প্রবাসী লাউন্স, প্রবাসী কল্যাণ ডেক্স, বীমা সুবিধা,ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার, ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া আদায়, মৃতদেহ দেশে আনয়ন, প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার, মৃতদেহ পরিবহন ও দাফনের খরচ প্রদান সহ বিদেশে কোনো প্রবাসী মারা গেলে তাকে দেশে আনার প্রক্রিয়া ও দাফন সম্পন্ন করা, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, কোনো নারী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে উদ্ধার করা ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে বেশ কয়েকজন বিদেশগামী যাত্রী ও রেমিটেন্স যোদ্ধাদের কাছে জানতে চাইলে তারা প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে জানায় যে, তাদের কল্যাণের নাম করে যে টাকাটা নেওয়া হয় প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের কল্যাণে ব্যবহার হয়না! বরং কল্যাণ বোর্ডের কর্তারাই এই টাকাটার সুবিধা ভোগ করে থাকে! 
বর্তমান মুদ্রমান (ডলার) ও বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করাটাকে অযোক্তিক মনে করে রেমিটেন্স যোদ্ধা কাতার প্রবাসী মমিনুল হক চৌধুরী বলেন বাজার মূল্যের সাথে কল্যাণ ফান্ডের কি সমর্পক!! আমাদেরই শতশত কোটি টাকা যেখানে পড়ে আছে। সেই টাকা কল্যাণ বোর্ড নিজেদের ইচ্ছে মতো বিভিন্ন ভাবে খরচ করে যাচ্ছে! যার অডিট থেকে শুরুকরে কোনো দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহীতার ধার ধারছেনা কল্যাণ বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এ যেন হরিলুটের মহারাজ্যে রুপ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড।

অথচ কল্যাণ বোর্ডের নামে অযাচিত মিটিং করে প্রত্যেক বোর্ড সদস্যের নামে মোটা অংকের সম্মানীভাতা সহ উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করে থাকে! অথচ আমাদের কল্যাণে কি কিছু হচ্ছে? না আছে আমাদের নিরাপত্তা! না আছে আমাদের সম্মান! এখন আবার আমাদের রক্ত চোষার জন্য কল্যাণ ফি ৩৫০০ থেকে ৫৫০০ করেছে! এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। 

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া গেছে। বিদেশগামী ও প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষায় গঠিত এই মন্ত্রণালয়টির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাতে সাধারণ কর্মীরা সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকে।

সিন্ডিকেট ব্যবসা ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়
সবচেয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশে কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী এজেন্সি সিন্ডিকেট তৈরি করে অভিবাসন খরচ অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়েও অনেক কর্মী শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের একটি অসাধু চক্র নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে এসব অনিয়ম আড়াল করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

‘স্মার্ট কার্ড’ ও বিএমইটি (BMET) ছাড়পত্রে জালিয়াতি
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র এবং স্মার্ট কার্ড ইস্যু করা নিয়ে ঘুষ লেনদেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দালালাল চক্র ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সঠিক কাগজপত্র থাকার পরও ফাইল আটকে রাখা হয়। দ্রুত কাজের বিনিময়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। আবার টাকার বিনিময়ে অদক্ষ ও ভুয়া সনদধারীদের ছাড়পত্র দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের ঘটনাও ঘটছে।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ঋণের ভোগান্তি
প্রবাসীদের সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’ থেকেও সহজে ঋণ পাচ্ছেন না গ্রহীতারা। ঘুষ বা কমিশনের বিনিময়ে ঋণ অনুমোদন দেওয়া, যোগ্যদের বাদ দিয়ে ভুয়া আবেদনকারীদের ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ সাধারণ প্রবাসীদের।

বৈদেশিক মিশনের লেবার উইংয়ে অবহেলা
বিদেশের শ্রম বাজারগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর ‘লেবার উইং’ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। বিপদে পড়া প্রবাসীরা যোগাযোগ করলে সহযোগিতা পান না বললেই চলে। পাসপোর্ট নবায়ন, বকেয়া বেতন আদায় কিংবা আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী সহায়তা কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা।

সচেতন মহলের দাবি
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়েই যদি এমন দুর্নীতি চলে, তবে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সিন্ডিকেট চক্র ভেঙে দেওয়া, সকল সেবা অটোমেশন ও ডিজিটাল করা এবং জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও প্রবাসী সমাজ।

 

মাতুভূমি/এএইচ

ম
মশি শ্রাবন

প্রতিবেদক

আপনার মতামত দিন

ফটো কার্ড ডাউনলোড করুন
News Image
dailymatribhumi.com
logo
+