বন্ধ থাকা সরকারি চিনিকলগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি মতিঝিলে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের (বিএসএফআইসি) প্রধান কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শামছুজ্জামান সুরুজ।
বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনায় দেশের চিনি শিল্পকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য হলো দেশের সব কারখানার চাকা সচল রাখা।
তিনি জানান, বর্তমানে বিএসএফআইসি’র অধীন ১৫টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে ৬টিতে আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে সেসব মিলের আওতাধীন এলাকায় আখ চাষ অব্যাহত রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব বন্ধ মিল পূর্ণ উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।
চিনিকলগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, "চিনিকলগুলো শুধু চিনি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং এটি লাখো আখচাষির জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় সামাজিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল পরিচালনা এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে এসব মিল বড় ভূমিকা রাখে।"
জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালালে প্রতিদিন প্রায় ৩৫লাখ টাকা ব্যয় হতো। তবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে এই খরচ অনেকটা কমিয়ে আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে আখের ছোবড়া (ব্যাগাস) ব্যবহার করে ‘কো-জেনারেশন’ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি চিনিকলের লোকসানের মূল কারণ হিসেবে ঋণের সুদ ও ‘ট্রেড গ্যাপ’-কে দায়ী করেন বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ঋণের সুদ ও শুল্ক বাদ দিলে সংস্থার প্রকৃত লোকসান তেমন একটা থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, গত অর্থবোর্ডেই কর্পোরেশন সরকারকে প্রায় ২১৩কোটি টাকা আবগারি শুল্ক, কর ও ভ্যাট দিয়েছে। বেসরকারি খাতের মতো সরকারি চিনিকলগুলোর সুদ মওকুফের সুবিধা পেতে সরকারের কাছে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া লোকসান কমাতে বিভিন্ন 'বাই-প্রোডাক্ট' তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আখচাষিদের উৎসাহিত করতে ইতোমধ্যে আখের দাম প্রতি কুইন্টালে ৬০০টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫টাকা করা হয়েছে এবং মোট প্রণোদনার পরিমাণ ৬কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
চাষিদের দ্রুত অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে একটি সফল পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ডিজিটাল এই প্রক্রিয়ায় আখের ওজন সম্পন্ন হওয়া মাত্রই চাষির মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে পাওনা অর্থ চলে যাচ্ছে। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমেছে। পাশাপাশি সফটওয়্যারের মাধ্যমে চাষিদের আবহাওয়া ও চাষাবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় চিনি শিল্পের ভূমিকা প্রসঙ্গে বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, গবেষণায় দেখা গেছে বিএসএফআইসি বছরে প্রায় ৬৬ হাজার ৪৫টন কার্বন শোষণে অবদান রাখছে। এমনকি ১০টি আখের ঝাড় একটি বড় বটগাছের সমপরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর চিনি শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে এই খাতকে দেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত করা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত দিন