২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত পাঠ্যবই তুলে দিতে চায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ মানসম্মত বই পৌঁছে দিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ছাপাখানায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ পুরোদমে চলছে। নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছাপাখানা থেকে মাঠপর্যায়ে বই গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণে এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে।
তদারকির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মোট ৫৩টি মনিটরিং দল মাঠে কাজ করছে। মানদণ্ড পূরণ না করায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নয়, বই গ্রহণের সময় মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট বই গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও শিক্ষকদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে। সরকারের লক্ষ্য, নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্মত ও নির্ভুল বই পৌঁছে দেওয়া।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মাদ গোলাম ফখরুল মাওলা বলেন, “এ বছর বইয়ের মানের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুণগত মান বজায় না থাকায় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাপানো ফর্মা ও ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নির্ভুল পাঠ্যবই উপজেলায় পৌঁছাতে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি নিরলসভাবে কাজ করছে।”
তিনি বলেন, অতীতে প্রেস ও মাঠপর্যায়ে অসাধু চক্রের যোগসাজশের সুযোগ থাকলেও এবার বই গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পরও মান নিয়ে কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহণকারী কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এনসিটিবির ২২ সেপ্টেম্বরের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও রয়েছে।
এবার গত বছরের তুলনায় এক মাস আগেই বই ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রেসে এসব বই মুদ্রণের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৪২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৩টি বা ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ ছাপা শেষ হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৬টি বা ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর মাধ্যমিক স্তরের ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২টি বইয়ের মধ্যে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০টি বা ৭ শতাংশ ছাপা হয়েছে।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে বাঞ্ছারামপুর, সরাইলসহ দেশের কয়েকটি উপজেলায় বই সরবরাহ শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় বই পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে ইংরেজি ভার্সন ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিশেষ বইগুলো জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ১১৩টি প্রেসের মধ্যে বর্তমানে ৯১টি প্রেসে বই ছাপার কাজ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবিলায় বড় প্রেসগুলোতে জেনারেটর ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নতুন বইয়ের কাগজের জিএসএম ও মুদ্রণমান নিশ্চিত করতে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্সির পাশাপাশি ল্যাব টেস্ট করা হচ্ছে। র্যান্ডম ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ৯টি প্রেসের কাগজের নমুনা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় সব কটি নমুনাই মানসম্মত পাওয়া গেছে।
পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম, অস্বচ্ছতা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে এনসিটিবির বিশেষ টিমের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকেও মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো হয়েছে।
এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে মোট ৫৩টি মনিটরিং দল কাজ করছে। এর মধ্যে এনসিটিবির ৩৩টি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭টি দল নিয়মিত ছাপাখানাগুলোতে তদারকি করছে। এ ছাড়া এনসিটিবির সচিব ও সদস্যদের নেতৃত্বে ৫টি বিশেষ দল মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত সরাসরি প্রেসে অবস্থান করছেন।
এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা ৮৫ শতাংশ এবং মুদ্রণমান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি পিডিআই এজেন্সির মাধ্যমে কেমিক্যাল ও গুণগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে বই সরবরাহে কোনো ধরনের নিম্নমানের কাগজের বই বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে এবার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কম মূল্যের অজুহাতে কেউ নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, “শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রেস মালিকদের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ শেষ করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠে নিয়োজিত দলগুলো প্রতিদিন প্রেসে অবস্থান করে কাজ তদারকি করছে। আমাদের মূল লক্ষ্য, বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা যেন নতুন শ্রেণির পুরো সেট বই হাতে পায়।”
মাতুভূমি/এসএফ

আপনার মতামত দিন